An archive of works produced, ideas explored, stages taken, conversations shared.
সামিনা লুৎফা নিত্রা
১৩ আগস্ট, ২০২০
১। অভিনয় ব্যাপারটাই গোলমালের:
আগের একটি লেখায় আমি অভিনেতা শব্দটার মধ্যে একধরণের পরাশ্রয়ের কথা উল্লেখ করে এর বদলে করণপ্রবণ ‘অ্যাক্টর’ শব্দটি ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়েছিলাম। তবে অভিনেতা শব্দের ব্যুৎপত্তির দিকে তাকালে মনে হয় ‘পরাশ্রয়’ প্রত্যয়টিকে আক্ষরিক অর্থে না দেখলে এর মধ্যে উপস্থিত নঞর্থক ভাবটি বদলে যেতে পারে। অভিনয় হলো যোগাযোগ বা কমিউনিকেশন যা সরাসরি করণপ্রবণতার ইশারা দিচ্ছে এবং এখানে অপর বা পর না থাকলে চলছেও না। অর্থাৎ, অ্যাক্টর আর অডিয়েন্স উভয়কেই তো লাগবে যোগাযোগ তৈরি করতে। উভয়েই আশ্রয়, কাজেই পর ও নিজের শরণ গ্রহণ করেই অভিনেতা একটি যোগাযোগ তৈরি করেন বা চেষ্টা করেন।
অভীষ্ট লক্ষ্যে নীত হওয়াই যদি অভিনয় হয় তবে অভীষ্ট লক্ষ্য তো দর্শকশ্রোতা/পর্যবেক্ষকের সাথে যোগাযোগটাই। কার সাথে তৈরি হবে এ যোগাযোগ? অ্যাক্টরের সাথে দর্শকের না চরিত্রের সাথে দর্শকের? অ্যাক্টরের অনুপস্থিতিতে চরিত্র কই থাকে? অ্যাক্টর ছাড়া চরিত্র যখন পান্ডুলিপিতে থাকে সে তখন পাঠকের সাথে যোগাযোগ ঘটাতে সক্ষম হলেও দর্শক বা স্পেক্টেটরের সাথে যোগযোগ ঘটাতে হলে অ্যাক্টরকে যে লাগবেই। তিনি ক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া করেন বলেই না যোগাযোগের সূত্রপাত বা সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু অ্যাক্টর যে ক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া করেন তা কি অ্যাক্টর হিসাবে না চরিত্র হিসাবে? অ্যাক্টর আর চরিত্রের পার্থক্য কী? বা আদৌ আছে কোনো পার্থক্য? এসব ধন্দে পড়তে হয় প্রায়ই। আর সেই ডিলেমা তো আছেই—অ্যাক্টর চরিত্রকে ধারণ করবে নাকি চরিত্রের ভেতর ডুবে যাবে? চরিত্র কি একটি পোশাক যা গায়ে চড়ালেই অ্যাক্টর চরিত্র হয়ে ওঠেন নাকি চরিত্রকে সন্তানের মতো করে নিজ দেহে পেলে-পুষে বড় করে প্রসব করতে হয়? নিজের সাথে বা সাথীদের সাথে এসব তর্কে কেটেছে বহু ঘন্টা-দিন। কিনারা সহজে মিলেছে বা গন্তব্যে পৌঁছেছে তর্ক এমন খবর পৌঁছায়নি কানে এখনো। কী করলে অ্যাক্টর হয়ে ওঠা যায় তা বোঝার চেষ্টা করতে করতে ২৪ বছরে পৌঁছে ভাবি, এ কেমন বিফল চেষ্টা—বুঝেও উঠতে পারলাম না এত বছরে!
আগেই বলেছি অভিনয় তত্ত্বে আমার দখল বড় নাজুক—অতশত বুঝিনা! এরকমটা বুঝি যে চরিত্র আর আমি তো এক নই। যত অন্যরকম তত সহজ, যত আমার মত তত কঠিন। কারণ অন্যকে ফাঁকি দেওয়া যত সহজ নিজেকে দেওয়া ততটাই কঠিন। তো যেহেতু আমরা দুইজন এক নই, আমার প্রথম কাজ হওয়া উচিত নিজেকে ভালোভাবে জানা ও বোঝা—প্রায় অসম্ভব কাজ বলেই এটা করতে করতে একটা জীবন বয়ে যেতে দেওয়া চলে। এ জানার প্রক্রিয়াটা স্বার্থপর। অ্যাক্টরকে নিজেকে নিয়ে অনেক ভাবতে হয়। বোঝাপড়াটা খুব জরুরি। তারপর হলো চরিত্রকে জানা। এটা অসম্ভব। নিজেকেই যে জানে না সে আর আরেকজনকে কেমন করে বুঝবে? কিন্তু চেষ্টাটা করতে হয়। প্রথমে নিজেকে জানার প্রক্রিয়ায় অ্যাক্টরের স্বার্থপরতা নিয়ে একটু কথা বলবো। নতুন কিছু নয়—এ আমরা বেশিরভাগটাই অনেকেই জানি!
২। অ্যাক্টরদের স্বার্থপর হতে হয়:
অ্যাক্টরদের কিছু বিষয়ে স্বার্থপর হতে হয়। প্রথমত, তার শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য তাকে স্বার্থপর হয়ে নিজের যত্ন নিতে হয়, চরিত্রের দুনিয়ায় (প্রদত্ত পরিস্থিতিতে) ঘোরাঘুরি করতে হয় দেশ-কাল-পাত্র-পরিজন ভুলে। অথিয়েটারীয় পরিজনেরা সবচেয়ে বেশি যে গালটি দিয়ে থাকেন তা হলো— স্বার্থপর!!! বৃষ্টিতে ভেজার মজা চলে যায় কারণ এই নয় যে আমার ঠাণ্ডার ধাত—সেসব আমলে নিতে আমার বয়েই গিয়েছে! কারণ এই যে দিন গুণে দেখতে হবে কতদিনের মধ্যে কোন নাটকের শো আছে। যদি ঠাণ্ডা লাগে তাহলে কী হবে এই ভেবে এই যে না ভিজতে পারা এটা আমার কাছে একরকমের স্বার্থপরতাই। নিজেকে হারিয়ে ফেলার সুযোগ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা—কিছু একটা পাবার আশায়! আর যদি বা বিপাকে পড়ে ভিজতেই হবে এমন অবস্থা হয়, তাহলে আগে খুঁজি সাথে কারও ছাতা আছে কিনা, থাকলে আমাকেই আগে দিতে হবে কারণ আমার শো আছে তাই ভিজতে মানা! অঅ্যাক্টররা ভিজুক, পুড়ুক, ধোঁয়া গিলুক, ধুলা খাক—অ্যাক্টরদের নাক-মুখ বন্ধ, মাস্ক পড়ে ছাতার তলায় থাকার দায়! অ্যাক্টরদের শরীর ঠিক রাখা নিয়ে এমন বাতিক থাকতেই হবে। নাহলে শরীর যদি বশে না থাকে তাহলে আর অভিনয় বা যোগাযোগ স্থাপন হবে কী দিয়ে? ক্রাচের কর্নেল বা খনার শো-তে ভালো খাবার, ভালো জুতা, ভালো মেকআপ, দূরে গেলে ভালো বাস—এর সবই চাই। কারণ শরীরটা ঠিক রাখতে হবে তো! নাহলে যোগযোগের মূল সেতুটাই দুর্বল হয়ে যাবে যে। তাই অ্যাক্টরদের স্বার্থপর হতে হয়। একই কথা মননের দিক থেকেও বলা যায়—অ্যাক্টরদের স্বার্থপর হয়ে সব পড়ে ফেলতে হবে, চরিত্র নির্মাণের জন্য যা যা জানা দরকার তার সবটা জেনে-পড়ে-বুঝে একটা বিশ্ববীক্ষা তৈরি করতে হবে যেন তার চেয়ে ভালো চরিত্র সম্পর্কে (চরিত্র নিজে ছাড়া) আর কেউ না জানে—এমনকি নির্দেশক বা লেখকের চাইতেও তার বেশি জানা দরকার। জানতে হয়। নাহলে হয় না! জানা না গেলে অনুমান করতে হয়। কাছে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে অবরোহ অনুমান বা ডিডাকশন করতে হয় (অনুমান যুক্তিবিদ্যায় যে অর্থে ব্যবহৃত হয় সে অর্থে ), আন্দাজে আগডুম বাগডুম ভাবলে হবে না ।
দ্বিতীয়ত, চরিত্র না অ্যাক্টর কার স্বার্থ আগে? মঞ্চে দাঁড়ালে চরিত্রের স্বার্থই আগে হবার কথা—কিন্তু তা আর পারি কই। সে গল্পে পরে যাব আজ বলি এক মজার চরিত্রের কথা যার স্বার্থ আমার ব্যক্তিস্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ায় আমি পড়েছিলাম এক বিরাট ফ্যাসাদে। Dog, Woman, Man—ঋতু সাত্তারের নির্দেশনা ও গ্রন্থনায় মঞ্চে আসে জার্মান কালচারাল সেন্টারে, নাটক ইংরেজি ভাষায়!!! সেখানে আমি অভিনয় করেছিলাম ওম্যান চরিত্রে। ওম্যান চরিত্রটির একটা ফেসবুক আইডি তৈরী করেছিলেন ঋতু, নাম দিয়েছিলেন—ক্রিস্টিন হলওয়ে! এমন একজন নারী যার জীবনটা নির্ভর করে একজন পুরুষের ওপর। ম্যান তাকে ভালোবাসে না বাসে না এই চিন্তায় ওম্যান অস্থির হয়ে যায়। সে কাঁদে-হাসে-অপেক্ষায় থাকে। তার বেঁচে থাকার সবটা নির্ভর করে পুরুষটির তাকে ভালোবাসার উপর। এরকম একজন নারীর চরিত্রের চেয়ে ব্যক্তি আমার চরিত্র এত আলাদা যে চরিত্র নির্মাণ সহজ হবে, কিন্তু ক্রিস্টিনকে মেনে নেওয়া কষ্টকর হবে বলে আমিসহ সবাই ভাবছিলাম। তবে ব্যাপারটা জটিল হয়ে উঠল যখন আমার মনে হতে থাকল যে এরকম একজন আমার খুব পরিচিত কেউ আছে। কিন্তু আমি তাকে মনে করতে চাইছি না। স্মৃতি হাতড়ে উদ্ধার করতে পারলাম যা তা আমার ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াল। কারণ ক্রিস্টিন একেবারে অষ্টাদশী আমার মতন, যে একজন পুরুষের উপর এমন নির্ভরশীল ছিল যে তার চাওয়া না চাওয়ার উপর আমার জীবন নির্ভর করত। অনেক ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সেই মেয়েটিকে চাপা দিয়েছিলাম দেড় কী দুই দশক আগে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম বছরটিতে আমি একেবারে ধসে পড়ার দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলাম যে নিত্রাকে নিয়ে (সে নিত্রা থেকে অন্য নিত্রা হবার চেষ্টা করতেও আমার মনে হতো দম বন্ধ হয়ে যাবে) সেই নিত্রাকে খুঁজে পেয়ে ভয় পেলাম। আমি এমন ছিলাম তা আমি জানতাম না তা-না, কিন্তু সেটা আমি চাপা দিয়ে দিয়েছিলাম এতো আগে যে এখন সেই নিত্রাকে অন্য মানুষ বলে ভয় করতে থাকল। ভাবতে লাগলাম যে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে গেলে যদি আর তা বন্ধ করতে না পারি! যদি আমার চেনা ক্রিস্টিন আর ফিরে যেতে না চায় তার চাপা পড়ে যাওয়া সত্তায়। সে যদি বলে বসে আমাকে চাপা দিয়ে যে নিত্রা হয়ে উঠেছ তুমি সে নিত্রার ভেতর থেকে আমি নিত্রা হয়ে আরেক সত্তা হয়ে রাতের আঁধারে বা দিনের আলোয় উঁকি দিতে থাকব। ফিরে যাবনা বরং মিস্টার হাইডের মতো তোমার দিনের জীবনটা দখল করে ফেলব—তাহলে! ওরকম পরনির্ভর জীবন আমি আর কল্পনাও করতে পারি না। কাজেই ব্যক্তি অ্যাক্টর না চরিত্র কার স্বার্থ দেখবো আমি? এই ভাবনা নিয়ে মহাবিপদে পড়লাম আমি। ডগ, ওম্যান, ম্যান নাটক যারা দেখেছেন তারা কেউ ওম্যানকে নিত্রার সাথে মেলাতে পারে না—দশটা শো’র একটাতেও না! অথচ সবাই আমাকে খনার সাথে মিলান। মনে করেন যে আমার মত খনা বা আমি তার মত। অথচ খনাকে খুঁজতে আমার যেতে হয়েছিল ব্রহ্মপুত্রের কাছে। আর ক্রিস্টিনকে গড়েছিলাম একেবারে নিজের আদলে!
আমাকে এক দর্শক বন্ধু বলেছিলেন, এরকম একটা চরিত্র তুমি কী করে করলে! এত দুর্বল, এত কাতর, এত লতানো! ক্রিস্টিন তার প্রেমিক দ্বারা ধর্ষিত হয় কিন্তু সে এক অদ্ভুত উপায়ে প্রতিশোধ নেয় বা আসলে মেনেই নেয়, প্রতিশোধ নেয় বলে ভাবে কিন্তু আসলে প্রেমিককে ছেড়ে যাবার সাহস যোগাড় করতে পারে না। তারা তাই একসাথেই থাকে। তারা একসাথেই থাকে! এই নাটক নিয়ে ঋতু সাত্তারকেও নিশ্চয়ই নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে, কিন্তু আজকের আলোচনায় এই চরিত্রের কথা উল্লেখ করার কারণ হলো চরিত্র করতে কত কী ভাবতে হয় আমাদের। যেমন: আমি এখনো ধর্ষিত হই নাই, যদিও প্রায় মধ্য চল্লিশে পৌঁছেও (কোনো কারণ না থাকলেও) হঠাৎ একদল পুরুষকে কোথাও আমার দিকে এগিয়ে আসতে দেখলে বুকের মধ্যে ঠিকই ‘ধক’ করে ওঠে। আমাদের পারিপার্শ্বিকতাই এমন! আমি ধর্ষণের দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য কাছের কারও একজনের প্রেমিকের কাছে ধর্ষনের গল্পই ধার করেছিলাম এবং সেই গল্পটা শুনতেই আমার অসহ্য অসহায় লাগত! আমার খুব কাছের মেয়েটির জন্য কিছু করতে না পারার বেদনা আর শুধু ঘটনা শুনেই আসল লোকটিকে শাস্তি দিতে চাওয়ার এবং তা করতে না পারার রাগে গা জ্বলত। শুধু শুনেই আসল লোকটিকে শাস্তি দিতে চাইতাম।
ধর্ষণ দৃশ্যটা সবচেয়ে কষ্টকর ছিল। প্রেমময় একটা মিলন মূহুর্ত হঠাৎ করেই ঈর্ষার ধাক্কায় একটা সহিংস ধর্ষণে পরিণত হয়। এমনিতেই ক্রিস্টিন দুর্বল—আমিও নিত্রার দুর্বলতার স্মৃতির উপর ভর করে দাঁড় করিয়েছি তাকে, তার মধ্যে ধর্ষণদৃশ্য তাও আবার প্রেমিকের হাতে! পুরো বিষয়টায় প্রেম থেকে শিকার হয়ে যাওয়ার পার্থক্য তৈরি করার সূক্ষ্ম দক্ষতার দরকার ছিল। আমার খুব অসহায় লাগত—ধর্ষণ দৃশ্যে অভিনয়ের অস্বস্তি ছিল না সেটা। প্রেম-ধর্ষণের স্থানান্তরণের ফাঁকে সম্পর্কের মধ্যে যে ভয়াবহ মাত্রায় ক্ষমতার চর্চা আছে সেটাকে পুরোপুরি ধরতে পারবো কিনা এসব টেনশনে অসহায় লাগত! টানা দশটি শো’র কোনোটিতে সত্যিকারের অন্য অসহায়ত্ব আমাকে চেপে ধরেনি তা নয়! যদিও আমি আরেকজনের প্রেমিকের কাছে ধর্ষণের গল্পই ধার করেছিলাম, মহড়ায় অনেক সময় সহ-অভিনেতার দিকে ভয়ে তাকাতে পারিনি সত্যি বিশ্বাসে যে সে প্রেমিক হয়েও ধর্ষণ করছে আমাকে! রাগে-দুঃখে চরাচর বিদীর্ণ করে দিতে ইচ্ছা করতো কিন্তু এ দৃশ্যের পর খুব দ্রুত দৃশ্য পালটে যেত। চরিত্রটি নিজেকে একেবারে পালটে ফেলত—সময়ের ব্যবধান ছিল গল্পে! ক্রিস্টিন যখন ধর্ষিত হতে থাকে তখন যখন সেই পরিচিত মেয়েটির চিৎকার মনে আসত তখন মনে হতো ক্রিস্টিনের প্রেমিককে শাস্তি দিতে পারলেই যেন ওই মেয়েটির শান্তি হবে! কিন্তু অভিনয়ের সময় এ ধরনের ভাবনা থেকে আমাদের নিজেদের সযত্নে দূরে রাখতে হবে যাতে আমরা মূল অনুভূতির বা আবেগের উপরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে না ফেলি। তাহলে তো সত্যি কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে, তাই না? কাজেই আমার এসব ভাবনাকে চেপে ধরে রাখতে হতো যাতে সত্যি সত্যি সহঅভিনেতা শাহাদাতকে মার না লাগিয়ে দেই! কীসব স্বার্থপর কাণ্ডকারখানা করতে হয় অভিনয় করতে গিয়ে। আশা করি বোঝা গেল আমাদের যন্ত্রণাটা! মঞ্চে অভিনয়ের সময় আমার চেনা মেয়েটির ধর্ষককে শাস্তি দিতে না পারা অসহায়ত্ব যদি আমার উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলে, তাহলে তার অভিঘাতে আমি আমার সহ-অভিনেতার জন্য বিপদের কারণ হয়ে যেতে পারি যদি আমি আমার স্মৃতিকে যথা সময়ে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারি!
উপসংহার
প্রতিটা মুহুর্তে আমাদের এমন সব নানা ঘাত-প্রতিঘাত নিয়ে খেলতে হয়। অভিনয় খুব কঠিন কাজ—নিজের আয়নার মুখোমুখি হওয়াটা সবচেয়ে বেশি কঠিন। সেই সময়টাকে, মূহুর্তটাকে তৈরি করতে অনেক অনেক অনেক স্বার্থপর হওয়া দরকার হয় অ্যাক্টরকে। অথচ খনার চাইতে ক্রিস্টিনই আসল নিত্রার মতো বেশি আসলে। কিন্তু আসল নিত্রা আসলে সত্যি কেমন বা কোনটা—ক্রিস্টিনের মতোটা নাকি খনার মতোটা সেটা আমি পুরো সমাধান করতে পেরেছি তা হয়তো না, কিন্তু কোনজন বেশি কাম্য সেটা আমি জানি। আর ঋতু কিছুটা জানে—কত কষ্টে ক্রিস্টিনের মতো নিত্রাকে ফেরত পাঠাতে পেরেছিলাম। চরিত্রের স্বার্থে তাকে বের করে এনেছিলাম আর নিজ স্বার্থে ফেরত পাঠিয়েছি। সব চরিত্ররা আমাকে পালটে দেয় না! কিছু চরিত্র আমাকে ‘না-পাল্টাতে’ সাহায্য করে।
একজন অ্যাক্টরকে স্বার্থপরের মতো তার ইমোশনাল মেমোরিকে ব্যবহার করতে হয়। স্মৃতি থেকে সেই মুহুর্তটি যেন মূর্ত হয় নিজের ভেতর, যেন সেই অনুভূতিটুকু মস্তিষ্কের মূল কর্মক্ষম অংশে বেরিয়ে আসে, সে যেন বিস্মৃতি থেকে অ্যাক্টিভ মেমোরিতে ঘোরাফেরা করে। তবে এরকম স্মৃতির যেগুলো খুবি বেদনাদায়ক বা ক্ষতের মুখ খুলে দেবার মতো, সেসব স্মৃতি উসকে আনার বিপদ আছে। সে বিপদে যদি কোনো অভিনেতা না পড়ে থাকেন তাকে বোঝানো মুশকিল যে অকালে চলে যাওয়া যে বন্ধুর প্রতি অভিমানে ছয় বছর পরেও শুধু তার নাম মনে পরলেই চোখ ভিজে আসে তার স্মৃতি অভিনয়ের সময় অনুভূতি উসকাতে ব্যবহার করতে যাওয়া কত বড় বিপদে ফেলতে পারে আপনাকে! সে যদি আপনার ধারে পাশে ঘোরাঘুরি করতে থাকে শোয়ের পরেও, তখন? কাজেই অভিনয় যিনি করবেন তাকে স্বার্থপর হতে হবে নিজের শরীর এবং মন নিয়ে।