An archive of works produced, ideas explored, stages taken, conversations shared.
সামিনা লুৎফা
১৯ নভেম্বর, ২০২০
আমি ন্যায়বিচার চেয়েছিলাম। আমি মনে করি মজনুর মতো ধর্ষকের জন্য বিদ্যমান আইনে সর্বোচ্চ শাস্তিই হয়েছে।
এই মামলার সারভাইভার শিক্ষার্থীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ওসিসিতে ভর্তি করার সময় থেকে আজ পর্যন্ত ওসিসি ও ঢাকা মেডিকেলের সকল চিকিৎসক, পুলিশ, ডিবি, র্যাব, সরকারী-বেসরকারী আইনজীবিগণ, সংবাদ মাধ্যমকর্মী, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক—যারা নানাভাবে সারভাইভারের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, মামলার জন্য কাজ করেছেন তাঁদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। স্যালুট জানাই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনাল ৭-এর মাননীয় বিচারক কামরুন্নাহারকে। তিনি অত্যন্ত শক্ত হাতে বিচক্ষণতার সাথে এ মামলা পরিচালনা করেছেন এবং সারভাইভারের জন্য ন্যয়বিচার নিশ্চিত করেছেন। তিনি আসামীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়েছেন, কিন্তু প্রত্যেক সাক্ষীর কাছ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জেনেছেন। আসামীপক্ষকে ভিক্টিম ব্লেইমিং-এর পথে যাবার সুযোগ দেন নাই। দ্রুততার সাথে বিচার শেষ করেছেন। তাঁকে ধন্যবাদ।
অনেকগুলো শুনানিতে আমি কোর্টে ছিলাম। আজকের রায়ের আগে-পরে মজনুর কাণ্ড দেখেও যারা মনে করতে পারেন যে মজনু ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী’কে ধর্ষণ করতে পারে কি-না তাদের জন্য সমবেদনা!
মজনু কী পারে সেটা আমার কাছে খুবই পরিষ্কার। চার্জ গঠনের প্রথম দিন থেকেই তাকে আমি খুব ভালোমতো খেয়াল করেছি। সে খুবই পরিকল্পিতভাবে এসব নাটক করে। সে জানে মিডিয়ার সামনে কেমন আচরণ করলে তার প্রতি সহানুভুতি বাড়বে। যে মিডিয়ার আড়ালে পাশে দাঁড়ানো কয়েদিকে ক্ষীপ্রগতিতে অনেক শক্তি নিয়ে আঘাতের পর আঘাত করে পরক্ষণেই ধমক খেয়ে সুর পালটে ফেলে কান্না জুড়ে দেয় সে পাগল নয়—অসম্ভব চালাক। একজন ছিঁচকে চোর বা ছিনতাইকারীর পক্ষে এটাই লাইফ স্কিল। এই চোখ রাঙানো, এই পায়ে পড়ে যাওয়া, এই কাপড় খুলে দৌড় দেবার চেষ্টা—সবই তার রাস্তার জীবন থেকে শেখা সারভাইভাল স্কিল। কোনোভাবেই পাগলামী নয়। ৫ জানুয়ারি সে তার শিকারকে লক্ষ্য করে, টার্গেট করে অতর্কিতে হামলা করে তাকে ধর্ষণ করে। সে কখনো ভাবেনি যে সে ধরা পড়বে। কিন্তু তার শিক্ষার অভাব, সামাজিকীকরণের সমস্যা তাকে বুঝতে দেয়নি যে তার হিসাবে ভুল হয়েছে। একজন ভুল মানুষকে সে ধর্ষণ করে চুপ থাকতে শাসিয়েছে! সে কল্পনাও করেনি যে কাউকে ধর্ষণের পর সে মেয়ে আবার এত থানা-পুলিশ-আদালত করবে। তার সামাজিক স্কিলে নারী দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ধর্ষণ করা যায়—সে পথের অসহায় নারীই হোক বা হোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। কারণ তার সাথে বিয়ে দিয়ে দিলেই হয়। এত কাণ্ড না করে সে রিকশা চালিয়ে খাওয়াবে—এটা তার বুঝ। বেশিরভাগ পুরুষেরই বুঝ এটা। ধর্ষকের সাথে বিয়ে দেওয়া আমাদের আইনেই আছে।
আদালতে তার যে আসুরিক শক্তির প্রদর্শন আমরা দেখেছি তাতে এক মুহুর্তেও বিশ্বাস করতে অসুবিধা হয় নাই এরকম আরো নারীকে ধর্ষণ করা তার পক্ষে খুবই সম্ভব। ছোটবেলা থেকে রাস্তায় ঘুরে বড় হওয়া মজনুদের জীবন এত কঠিন, বেঁচে থাকা এত জটিল যে তাঁদের অস্বাভাবিক জীবনীশক্তি থাকতে হয়। আমাদের ভদ্র মধ্যবিত্ত মানস দিয়ে তাকে বুঝতে যাওয়া বা বুঝতে পারা ব্যর্থ হতে বাধ্য। আমাদের ভদ্রলোকের লিভিংরুমের সংস্কৃতির সাথে তার পরিচয় নাই তা নয়, তবে সে সেটার ধারক নয়। সে ভদ্রলোকের মতো করে ধর্ষণ করে বড় উকিল রেখে ভাব দেখিয়ে জামিনে ঘুরতে পারে না। তার পক্ষে কেবল সে নিজে আর তার রাস্তায় বেঁচে থাকার সামাজিক দক্ষতা। এ কারণেই সে কামড়ে দেয়, যুক্তিহীন কথা বলে এবং অশ্লীল গালাগাল দেয়। কারণ সে দেখেছে ভদ্রলোকেরা এসবে বিব্রত হয় এবং এর আগেও অনেক অপকর্মের পর এসব করে সে ছাড়া পেয়েছে। তার বাস্তবতা অনুযায়ী তার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা আমাদের পক্ষে বোঝা দুষ্কর। সে চতুর, ধুর্ত এবং কৌশলী।
ফুটপাথের ভিড়ে, বাসে, ট্রেনে, রাস্তায়, ঘরে নারীর শরীর ‘হাতিয়ে-হাতিয়ে’ এসব ধুর্ত নরকের কীটেরা একদিন ধর্ষক হয়। আর আমরা খুব ইনোসেন্ট ভাব করে বলি: এমা এ কেমন করে এটা করতে পারবে!! কোনোদিন ভিড়ে মেয়েদের শরীর হাতানো বীর-পুঙ্গবদের কষে চড় দিয়ে দেখেছেন কেমন মিনমিন করে? সেই বীররাই সুযোগ পেলে ফোস করে ফণাও তোলে। মজনু সেই সব ‘মাল হাতিয়ে সুখ পাওয়া’ শয়তানদের এক্সটেনশন – আপনাদের অনেকের মতো! এজন্যই আপনাদের এত অবিশ্বাস!
এই বাংলাদেশের মানুষ মজনু তাদের সামনে ধর্ষণ করলেও কোনো না কোনোভাবে তার পক্ষেই দাঁড়িয়ে যেত, এমনই এইদেশের ধর্ষণ সংস্কৃতি। তাই কে কী ভাবলো বা কী বিশ্বাস করল তাতে আমার কিছুই আসে যায় না। মজনুর সর্বোচ্চ শাস্তি আমি চেয়েছি দেশের একজন নাগরিক হিসেবে, মা হিসেবে, শিক্ষক হিসেবে—আমি মজনুর শাস্তি চেয়েছি। আমি চেয়েছি এটা দৃষ্টান্ত হোক যেন আমার কোনো শিক্ষার্থী, কোনো মেয়ে, কোনো বোন ফুটপাথে হাঁটতে ভয় না পায়। সন্তানদের মজনুদের ভয়ে আটকে রাখবেন না। ওদের মজনুদের শায়েস্তা করতে ছেড়ে দিন!