An archive of works produced, ideas explored, stages taken, conversations shared.
সামিনা লুৎফা নিত্রা
২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮
আমি একজন ‘অশিক্ষিত অ্যাক্টর’ – অক্সিমোরোন হল নাকি? হলে হল। সোনার পাথর-বাটি মানে অসম্ভব।
অ্যাক্টর শব্দটাতে যেমন একটা করণপ্রবণতা (এজেন্সি) আছে অভিনেতা শব্দটার মধ্যে তা নাই। অভিনেতা শব্দটা শুনলেই কেমন একটা মনে হয়—যেন অন্যের উপর আশ্রিত কেউ। অন্যের মতন। এটা আর কারও হয় কিনা আমি জানি না। আমার হয়। আর তখনই আমার মনে একটা উসখুস উপস্থিত হয়। প্রায় ২২ বছর আগে যখন প্রথম অভিনয় শিখবার আর করবার অদম্য ইচ্ছা নিয়ে বাংলাদেশের গ্রুপ থিয়েটারের কাঠমোতে প্রবেশ করেছিলাম, তখন অভিনয় নিয়ে আমার নিজের কোনো ভাবনা ছিল না। অভিনয় শিখে ফেলেছি সে দাবি করতে না পারলেও অভিনয় নিয়ে এই বাইশ বছরে একটা নিজস্ব বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। সেই বোঝা থেকেই উসখুসের উৎপত্তি। মানে আমার অভিনেতা/অভিনেত্রী শব্দে উপস্থিত নির্ভরশীলতার বোধটা ভালো লাগে না—পরাশ্রয় মনে পীড়া দেয়।
অশিক্ষিত বলেই এই লেখায় কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা আমি করব না, সে আমার ঠিক সহজাতও নয়। আমি খুব নগণ্য অভিনয়চেষ্টার কালে কী কী করেছি—সামান্য বুঝে, বেশিটাই না বুঝে তা নিয়ে একটা মোটাদাগে স্মৃতিচারণ—কিন্তু সেই স্মৃতির পুরোটা জুড়েই আমার করণপ্রবণ অ্যাক্টিংয়ের পক্ষে ভেতরে ভেতরে তৈরি হবার গল্প। তা থেকে অন্যকিছু পাওয়া গেলে তার পুরোটাই উপরি।
আমার কাছে অভিনয় মানে কী, একথাটা শুরুতেই বলেছি। কেন করি, এটা জানতে চাইলে, উত্তরে বলব, আমি পৃথিবীটা যেমন দেখি এবং যেমন দেখতে চাই—সেটা জানতে আর জানাতে আমি অভিনয় করি। আমি যেসব নাট্যে অংশ নেই তা আমার এই পৃথিবীকে দেখার বা জানার বা ভবিষ্যত আঁকার সাথে সম্পর্কিত। মঞ্চে বা অভিনয়ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে মানুষের জীবনের জটিল সম্পর্কসূত্রের মালা উন্মোচিত হয়—কিছু জটিলতা প্রকাশ্য কিছু গোপন এটা সত্য তবু তা যোগাযোগের সীমায় আসে। কখনো এইসব করতে করতে নিজের সাথে নিজের ও অপরের সম্পর্কের জটিলতাও স্পষ্ট ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়।
আমার প্রথম দিকে মনে হতো যে অভিনয় মানেই অন্যের মতো হওয়া, বা অন্যের ভেতরে ঢুকে পড়া বা নিজের ভেতরে অন্যকে ঢুকিয়ে ফেলা। কিন্তু আমি নিজের অভিনীত চরিত্রগুলো বিশ্লেষণ করতে করতে নিজের করণপ্রবণ হওয়ার একটা প্রক্রিয়ার গড়ে ওঠা দেখতে পেলাম। যেমন আমার লেখা ‘খনা’ নাটকটির খনা চরিত্রটি যেভাবে অভিনয়ের জন্য নির্মান করি তা নিয়ে আমাকে বিগত ১০ বছরে বিস্তর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। যেমন একটা অন্যতম প্রশ্ন দেশের নাট্যবন্ধুদের কাছ থেকে প্রায়ই শুনি তা হলো, খনা কেন আমার (সামিনা লুৎফা) মতো? মানে তার হাঁটাচলা, কথা বলা বা চেহারা সব নাকি আমার মতো। এ প্রশ্নটা আমাকে কিঞ্চিৎ অসহায় আর কিঞ্চিৎ বিস্মিত করে। অসহায় করে কারণ নাটকটি যখন লেখা হয় তখন আমি বাংলাদেশ থেকে বহু দূরে—ব্লু মাউন্টেনের কোলের মধ্যে হেলারটাউন গ্রামে ব্ল্যাক রিভার নামের এক খরস্রোতা পাহাড়ি নদীর পাড়ে একা একা ঘুরে বেড়াই, নিজের ভেতর নতুন প্রাণের অস্তিত্ব বুঝে ওঠার চেষ্টা করি আর দেশের জন্য মন খারাপ করে দিন কাটাই। দেশের জন্য দলের জন্য নাটক লিখলাম জেনে-বুঝে যে এই নাটকে আমি অভিনয় করতে পারব না। কাজেই তখন দলে কাজ করতেন এমন নারীদের একজনের কথা ভেবেই নাটকটি লিখেছিলাম। নিজের জন্য না—কারণ নাট্যকার তো নাটকটাই লেখেন, অভিনয়ভাবনা লেখার সময় থাকার কোনো কারণই নাই। আর ২০০৫/৬ এ অভিনয়ক্ষেত্রে নিজের দক্ষতা সম্পর্কে যথেষ্ট হীনম্মন্যতা কাজ করত—নিজের শারীরিক গঠন আর চেহারায় ‘বাঙালি নারীত্বের’ যথেষ্ট উপাদানের অভাব প্রসঙ্গেও আমি অবহিত ছিলাম। কিন্তু নাটকটি লেখা শেষ হবার পর অনেক দিন চলে গেল—নাটকটি হলো না। যিনি নির্দেশনা দেবেন বলে কথা পাকা ছিল, তাকে দল থেকে দায়িত্ব দেয়া হলো না। দেশে ফিরলাম তারপরও অনেকদিন কেটে গেল—বিস্তর খ্যাতিমান নির্দেশকেরা পাণ্ডুলিপি পড়ে ফিরিয়ে দিলেন। একজন বললেন, নাটকই হয়নি। যাক সেসব অন্য অল্প, আরেকদিন লিখব। একপর্যায়ে মোহাম্মদ আলী হায়দার নির্দেশনা দিতে চাইলেন, তাঁকে প্রথমে মানা করা হলো, তারপর নানা রকম নিরুৎসাহিত করাও চলল। পরবর্তীতে তিনিই শেষপর্যন্ত নাটকটিকে উদ্ধার করলেন। নির্দেশনা দিলেন। খনা দারুণ সফল হলো। প্রথম মঞ্চায়ন হয় সুবচন নাট্য সংসদ থেকে—২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে শিল্পকলার পরীক্ষণ হলে। ১০টি প্রদর্শনীর পর সুবচন আর নাটকটি করে নি। বটতলা নাটকটিকে মঞ্চে আনে ২০১০ সালের মার্চে—আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শততম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে নারী সংহতির ডাকে—কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে—খোলা আকাশের নিচে। দুই দলেই প্রথমে খনা চরিত্রে আমি অভিনয় করেছিলাম।
নির্দেশক খনা চরিত্রটিকে যেভাবে দেখতে চাইলেন, আমি অভিনয় করার শুরুর দিকে সেভাবে চরিত্রটি ভাবিনি। ফলে আমার সাথে নির্দেশকের দ্বন্দ্ব উপস্থিত হলো। আমি দেখেছিলাম একজন প্রাজ্ঞ নারীকে যিনি সত্যের পক্ষে দাঁড়ান। কিন্তু নির্দেশক দেখলেন একজন সজীব সপ্রাণ নারীকে যিনি সকলের আপন। তার মধ্যে যেন এক অবাক নদী কলকল ছলছল চলে। যেদিক দিয়ে যায়—সে প্রাণ রাঙ্গিয়ে দিয়ে যায়। ২০০৭ সালে যখন খনা চরিত্রটি রূপায়নে আমি ঢুকি, তখন আমি দেশ-বিদেশ ঘুরে বেশ পোড় খাওয়া ‘নাগরিক’ হয়ে উঠেছি। শৈশব-কৈশোরের ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে হেঁটে বেড়ানো পাগলা ধরনের ‘মেয়ে’টির খুব বেশি অবশিষ্ট ছিল না। আমি ২০০৭/৮-এ খনার মতো সপ্রাণ ছিলাম না। কাজেই খনা মোটেও আমার মতো নয়। ফলে যখন চরিত্র রূপায়নের চেষ্টা করলাম—দেখি এর তল খুঁজে পাই না। এমন সহজিয়া এমন মরমি মানুষ বাইরে থেকে দেখে ভেতরে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। নিজের লেখা চরিত্র—তারপরও অসংখ্য পাঠের পরও তাঁকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তারপর একদিন নির্দেশকের সাথে ঝগড়াঝাটির একপর্যায়ে হঠাৎ মনে হলো যেন আমার শৈশবের নদী-জল-কচুরিপানা-কাশবনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ওলটপালট বাতাসের সাথে কখনো তিরতির কখনো প্লাবিত করে চলা প্রিয়তম ব্রহ্মপুত্র ছাড়া আর অন্য কোনো মানুষ এই চরিত্রের সজীবতা বা প্রাণদায়িনী ক্ষমতা ধরতে পারছে না। ফলে এই প্রথম, অন্য মানুষের ভেতরে ঢোকার বা নিজের ভেতরে অন্য মানুষকে ঢোকাবার চেষ্টা ছেড়ে নিজের ভেতরের শৈশবের সতেজতায় ডুব দেবার চেষ্টা করতে লাগলাম। আমার প্রিয় নদী— ব্রহ্মপুত্র, সাদা কাশবন, সবুজ ধানক্ষেত আর হলুদ সরিষাক্ষেত—আমার কাছে খনাকে নিয়ে এল। মানবী নয় প্রকৃতি থেকে পেয়েছিলাম খনার খোঁজ। এখন ভাবি, না বুঝেই বোধহয় বিরাট কোনো এক তত্ত্বের পদ্ধতি ব্যাবহার করে ফেলেছিলাম। এরমানে আমি বিরাট পণ্ডিত এটা বোঝাতে চাইছি না, বোঝাতে চাইছি মানুষ এভাবেই নিজের ভেতর ‘অপর’ কে এবং তারই মধ্য দিয়ে ‘অপার’ কে ধারণ করতে পারে। তত্ত্বসমূহ মানবেতর কিছু নয়। অ্যাক্টর এবং তাত্ত্বিক উভয়েই তার নিজের দেহে তো বটেই মনে ও মস্তিষ্কে ভাবনায় ও চৈতন্যেও আটকা—এর বাইরে কোনোকিছু ভাবার সাধ্য তার কই? কিন্তু মানুষ কখনো কখনো এ বিষয়গুলোর মূল্য বুঝে হঠাৎ ভাবে—আমি পাইলাম, ইহাকে আমি পাইলাম। সে কখনো চরিত্র আবার কখনো তত্ত্ব। কগনিশন (চিন্তন) বড় অদ্ভুত প্রক্রিয়া—অভিনয় আপাদমস্তক দারুণ এক কগনিটিভ (চিন্তা) প্রক্রিয়া।
শুরুতে বলেছিলাম যে বন্ধুদের খনার সাথে আমার মিল প্রসঙ্গের অবতারণায় আমার বিস্ময়ও জাগে, ইদানীং। কারণ আমি দেখি যে খনার জেদ, তার দুর্বিনীত স্বভাব, তার একরোখাপনা, তার সত্যের প্রতি বা প্রান্তিকের স্বরের প্রতি ঋজু দাঁড়িয়ে থাকার সাহস কোনোটাই আমার অঢেল ছিল না। খনা চরিত্র করার আগে অবশ্যই ছিল না। লিখতে গিয়ে গত ১৬ বছর ধরে তার সাথে বাস করতে করতে—বা গত ১০ বছরের অভিনয়কালে তাঁর থেকে যতোটা পেয়েছি তার কিয়দাংশও দেই নাই তাঁকে। খনা আমাকে যতটা সাহসী হতে শিখিয়েছেন তত সাহস আমার কস্মিনকালেও ছিল না। খনা যা করতে চেয়েছিলেন, সেই রকম হবার একটা আকাঙ্ক্ষা আজকের অনেক নারীর মধ্যেই আছে—আমিও তাঁদেরই একজন ছিলাম। কিন্তু অত সাহস ছিল না যাতে আমাকে কেউ খুব সাহসী বা একরোখা বলতে পারে। বলেওনি কোনোদিন। অন্তত ২০০৮/৯ এর আগে আমি ভদ্রগোছের ভাল ছাত্রী হিসেবেই পরিচিত ছিলাম। একটু বেশি কথা বলতাম ঠিকই কিন্তু উচিত কথা মানুষকে শুনিয়ে দিতে পারতামই না। কিন্তু আজকাল প্রায়ই শুনি আমি নাকি খুব একরোখা, ‘মুখরা’ আর ‘বেয়াদব’ হয়ে উঠেছি—সঙ্গদোষে শুনেছি লোহা ভাসে—আর এটা তো খনা নামের কিংবদন্তির সাথে বসবাস—আমার মতো ব্রাত্যের আর না ভেসে উপায় কি!
আমার চরিত্রগুলো আমাকে বদলে দেয়—অ্যাক্টর হিসেবে যেমন, তেমনি মানুষ হিসেবেও।
এই যে আমি অ্যাক্টরের করণপ্রবনতার কথা বলছ—এর মাঝে আরেকটা কথা না বললে বোধহয় বড় ফাঁক থেকে যাবে—সেটা হলো নির্দেশকের সাথে অ্যাক্টরের সম্পর্ক এই করণপ্রবণতাকে কীভাবে প্রভাবিত করে বা আদৌ করে কিনা। বা সবটুকুই আসলে নির্দেশকের কীর্তি কিনা। এ ব্যাপারে আমার মনে হয়, নাট্যমঞ্চে যাবার আগ পর্যন্ত নির্দেশকের সাথে অনেক কথা বলাটা খুব দরকার—কারণ তাঁর কাছে আছে পুরো ব্যাপারটার নকশা-ছক। সে চরিত্রের যেসব দিক নিয়ে ব্রিফ করবে তাঁর থেকে একেবারে দূরে গিয়ে অভিনয় হয় না—হবে না। তবে দিনশেষে নির্দেশক অ্যাক্টরকে দেখাতে পারেন একটা পথ—কিন্তু হাঁটতে হবে অ্যাক্টরকেই, তাঁর পথ কেউ হেঁটে দিতে পারবে না। নির্দেশক তো নয়ই। নির্দেশকের বয়স যাই হোক না কেন, মানব চরিত্রের নানাদিক নিয়ে তাঁর পরিষ্কার ধারণা না থাকলে বা সমাজ-সভ্যতা তত্ত্বের কিছুই তাঁর জানা না থাকলে অ্যাক্টরকেই সেসব খুঁজে বের করতে হবে। সব অর্থেই নির্দেশকের কল্পনাকে ছাপিয়ে যেতে হবে—ছেড়ে গেলে চলবে না। তবে মঞ্চে অ্যাক্টর পৌঁছে যাবার পর অ্যাক্টর স্বয়ম্ভু হয়ে যান—তাঁর উপর নির্দেশকের কোনো নিয়ন্ত্রণ আদতে থাকে না। উৎপল দত্ত আমার সাথে একমত না হতে পারেন কিন্তু নির্দেশক আমার মুখের উপর আলোটা একটু তেরছা করে ফেলতে বলেই আমার মুখমণ্ডল হতশ্রী হয়ে দর্শকের কাছে পৌঁছাবে—এসব ভয়ের কাল গিয়েছে। নির্দেশক কী বলে দিয়েছেন সেকথা মহড়ায় অবশ্যই মনে রাখতে হবে, কিন্তু মাথায় নিয়ে বসে থাকলে কারো আর মঞ্চে চরিত্রায়ন করতে হবে না। সবাই নির্দেশকের মতো অভিনয় শুরু করবেন। কাজেই সৃজনশীল বুদ্ধিমান অ্যাক্টরকে নিজের ভেতরের পথটা আগে খুঁজে বের করতে হবে। তারপর নির্দেশকের দেখানো পথে হাঁটলেও নিজের যাত্রাটা থেকেই যাবে।
মোদ্দা কথা যেটা বলতে চাইছি—তা হলো অ্যাক্টর নিজের শরীর আর মনের সীমানায় আটক। তাই তার প্রণোদনাও তাঁর নিজের ভেতর থেকেই আসতে হয়। চরিত্রকে খুঁজে বের করতে হয় নিজের অভিজ্ঞতা আর কল্পনার মিশেলে। তবে ‘শো অফ’ না বরং একেবারে একান্ত নিজ অনুভূতি আর আবেগের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে। তবে অ্যাক্টর কখনো সমাজ সংস্কৃতি আর রাজনীতি বিচ্ছিন্ন হতে পারবেন না—কারণ কোনো চরিত্রই সমাজ, সংস্কৃতি আর রাজনীতি বিচ্ছিন্ন হতে পারবে না। আমার মনে হয়—এতক্ষণ যা কিছু বললাম তার সবটাই সকলের জানা। কেবল আমার অভিজ্ঞতার সাথে মিলিয়ে নেওয়া মাত্র।