An archive of works produced, ideas explored, stages taken, conversations shared.
সামিনা লুৎফা
সেপ্টেম্বর ২০২১-জানুয়ারি ২০২২
একজন অশিক্ষিত অ্যাক্টরের অভিনয় ভাবনা নামের সিরিজ যখন লিখতে শুরু করেছিলাম, তখন উদ্দেশ্য ছিল আমার অভিনীত চরিত্রগুলির সাথে পাঠকের পরিচয় ঘটানো এবং অভিনয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে আমি যা ভেবেছি বা অভিনয় করতে মনস্থির করার পর থেকে একটি চরিত্রকে এঁকে তুলতে কোন কোন ধাপ পার হয়েছি তার একটা সারোৎসার টুকে রাখা, যাতে করে এ নিয়ে যাদের আগ্রহ আছে তারা তাদের দেখা আমার কোনো চরিত্রের সাথে আমার চরিত্র আঁকার যাত্রাটুকুও ধরে ফেলতে পারেন। তবে আজকের পর্বটা অনেক ভিন্ন এ কারণে যে, প্রথমত, যোজনগন্ধা মায়া নাটকটি এখনো মঞ্চায়িত হয়নি, দ্বিতীয়ত এ নাটকে আমার চরিত্র কোনটি সেটা ঠিক হয়নি। তৃতীয়ত, নাটক কয়েকদিনের মহড়ায় পৌঁছেছিল একটা কোনো ‘কোথাও না’-তে। মানে নাটকটির দৃশ্যরূপ তৈরিই হয়নি। কাজেই আমার একটা আপাত-খণ্ডিত যাত্রার বিষয়ে পাঠকের পরিচয় ঘটবে। সিরিজের অন্য লেখার মতো থিয়েটারি এই আলাপেও আমি তত্ত্ব থেকে দূরে থাকব, এ কারণে না যে আমি তত্ত্ব কম বুঝি (সেটা অবশ্য খুব একটা অসত্য নয়), এ কারণে যে আমপাঠক তত্ত্বের বিচার করে না সাহিত্য পড়ার সময়। আমপাঠকের জন্য সাহিত্যপাঠের আনন্দ কেবল আনন্দের নিমিত্তেই। মনানন্দেই পড়ি।
২০২১-এর জানুয়ারি থেকে বটতলা যোজনগন্ধা মায়া নাটকের মহড়া শুরু করে। আমরা গবেষণায় বসি এই নাটকের চরিত্রগুলো নিয়ে। নাটকে চরিত্র ছিল অনেক, কিন্তু আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম একজন পারবে পুরোটা। সে পরিকল্পনা নিয়ে এগোলেও আমরা আসলে ছিলাম ৩/৪ জন। তার মধ্যে তিনটা চরিত্র হায়দার আমাকে দেখতে বলেছিল: কুরুমনি, কাজলবানু, মনিলতা। এই নাটকের অভিজ্ঞতা নিয়েই আজকের আলাপ।
যাক, কাজের কথায় আসি! আচ্ছা, এমন কখনো হয়েছে আপনাদের যে আপনি হয়তো কোনো একটা বিষয় নিয়ে বুঁদ হয়ে ভেবে চলেছেন, আর ধ্যানী প্রদক্ষিণে সারছেন দিনের শুরুর আপাত গুরুতর খুঁটিনাটি কাজ। এমন সময় ডিম ভাজতে ভাজতে বা রাতে ওয়াশিং মেশিনে ভুলে রয়ে যাওয়া ভেজা কাপড়ের অর্ধেক শুকাতে দিতে ঘর-বারান্দা করার ফাঁকে বেভুলে ছড়ানো কোনো একটা বই তুলে যেকোনো পাতা উলটে পড়তে শুরু করে দিলেন? হয় নিশ্চয়ই! আমার হয়। পড়তে গিয়ে এমনকি হয় আপনাদের কারও, যে এতক্ষণ যে ভাবনার গভীরে ছিলেন (আমি সাঁতার জানি না বলে জলের গভীরে ডুব দিলে কী অনুভূতি হয় তা আমার জানা নেই, তাই বাগাড়ম্বর করলাম না), বইয়ের পাতায় তাই লেখা হয়ে ফুটে আছে? এর মধ্যে ডিম পোড়া লাগে বা অর্ধেক কাপড় মেশিনেই থেকে যায় আবার। আমার প্রায়ই হয়। আর আমি ভাবি, কী আশ্চর্য!
এরমধ্যে কেটলির পানি বলকে-ছলকে রান্নাঘরের মেঝেয় স্বচ্ছ নকশা এঁকে ফেলে। আর আমি দৌড়ে চুলা বন্ধ করতে গিয়ে টের পাই সেই স্বচ্ছ জলীয় নকশা আসলে ভিজিয়ে দিয়েছে আমার পায়ের তলা। আপনাদের কী মনে হয়, আমি বেশ অপার্থিব বিশেষ ক্ষমতাধর? বিশ্বাস না হলে নিচের লেখাটা একটু পড়ে নিন যেটা আমি আজকে হঠাৎ গাড়িতে উঠেই পড়তে শুরু করেছিলাম। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে চলমান আন্দোলনে অনশনের আজ ছিল ৬ষ্ঠ দিন। শিক্ষক–শিক্ষার্থীর সম্পর্ক নিয়ে ভাবছিলাম। ভাবছিলাম যে শিক্ষকরা কেমন করে এমন আস্থাহীনতার কাদায় ডুবিয়ে দিলেন তাদের কান যে শিক্ষার্থীদের দেশ কাঁপানো স্বর তাদের কানের আশপাশেও পৌঁছাচ্ছে না! এদিকে অনেকদিন আগে পড়ে প্রিন্ট করে রাখা একতাড়া কাগজ নিয়ে তাড়াহুড়ায় গাড়িতে উঠে যাচ্ছিলাম আশুলিয়ায়। এর মধ্যে একটা ছিল স্ট্যাপলার মারা কম্পিউটার প্রিন্ট যার ভেতর থেকে কথাশিল্পী বদরুজ্জামান আলমগীর তাকিয়ে আছেন। লম্বা চুল উড়ে এসে পড়েছে চোখে মুখে। চশমার প্রতিবিম্বে সামনে খোলা ল্যাপ্টপের আলো! এক গুচ্ছ প্যারাবোল হৃদপেয়ারার সুবাস! দ্বিতীয় লাইনেই, বোমা ফাটলো আমার মাথায়:
“মর্মের বাগানে গুরু একা মুরশিদ হয় না, ভূবন অর্থে তাতে অদলবদল লাগে। গুরু যদি শিষ্য না হয় সেই গুরু সরকারি আমলার সামিল—তাতে ভরসার মধু মেলে না!” বা “এক্ষেত্রে পিঁপড়া গুরু, মানুষ তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করুক” এমন এমন বাক্য ! তাহলে কি আমার এক্স্ট্রা সেন্সরি পারসেপশন বেশি? আমি যা ভাবি তাই আমার সামনে বইয়ের লাইন হয়ে দাঁড়ায় কেন?
ধ্যাত, তাই হয় নাকি? আমি আসলে ‘সেই’ লেভেলের আম-পাঠক!
হয়েছে কী বলি, শুনুন: এটাকে বলা চলে একধরনের ভ্রান্তি ! আমি যা ভাবি তা যেমন এই মূহূর্তে এখানে তো পরমুহূর্তে সুইডেন চলে যেতে পারে, বইয়ের মধ্যে আমি যা হঠাৎ বের করে পড়তে থাকি তার বেশিরভাগই তেমন—একবার দিল্লী তো পরমুহূর্তেই কন্যাকুমারী। তবে বইয়ের এরকম লাইনের মধ্যে সেগুলোর কথাই মনে থাকে যেগুলি মিলেছিল ভাবনার কোনো এক মুহূর্তের সাথে মুহূর্তের যোগবিন্দুতে। কাজেই আমি এক্সট্রা সেন্সরি নই বরং আমপাঠক—একটু বেশি ভুলোমনা যে বাদবাকি ইররেলেভেন্ট লাইনদের ভুলে যায়। কারণ সেই লাইনগুলি নির্বাচনী দৌড়ে থাকতে পারে না—ঝরে পড়ে। যদিও সম্পূর্ণ কাকতালে!
তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে যে, সেই মুহূর্তের সাথে মুহূর্তের মিলনবিন্দু কখন ঘটে বা কেমন লেখায় ঘটে? সাধারণত আমি সারাদিনে অনেক অনেক লাইন পড়ি। বেশিরভাগই মনে থাকে না। সেগুলিই মনে থাকে যেগুলো আমার ভাবনার বা স্বপ্নের সাথে মেলে! একদিন অতিমারিকালে এরকম একটা অলস সকালে যেদিন আমার গুরুতর খুঁটিনাটি কাজের চাপ কম ছিল, শুক্রবার ছিল কিনা মনে নেই, আমি ঘুম থেকে উঠে বারান্দার দরজা, জানালার পর্দা খুলে এসে ফেসবুকে ঢুকলাম। পেলাম একটা ঝাঁ চকচকে আনকোরা ধোঁয়া-ওঠা লেখা—বদরুজ্জামান আলমগীরের যোজনগন্ধা মায়া। তখনই পড়ে নিলাম একবার, তারপরে আরেকবার। তারপর ভাবলাম এটা আমার ভাবনার সাথে এত মিলে গেল কী করে? এর সপ্তাহখানেক আগে পুরোনো-পড়া ওয়েটিং ফর গডো’র আবার পড়া থেকে কিছু লাইন ঘুরছিল এবং আরও নানাকিছুর কথা মনে হয়ে নাটকটা মাথায় গেঁথে গেল।
“ভ্লাদিমির: শুরু করাটাই সমস্যা!
এস্ট্রাগন: যে কোথাও থেকেই শুরু করা যায়
ভ্লাডিমির: হ্যাঁ, কিন্তু সে যে কোথাওটাও তো তোমাকে ঠিক করতে হবে!” (অনুবাদ আমার)
শুরু করাটাই ঝামেলার! এই নানা কিছু বা শুরু করা কোনোটাই একেবারে কাকতালীয় না কিন্তু! বদরুজ্জামান আলমগীর আমার প্রিয় লেখক। আমার যেকোনো লেখার মধ্যে যেমন আমার নাগরিক কেজো চালাকিমার্কা নৈর্ব্যক্তিকতা তৈরির প্রবল চেষ্টা হাঁ করে থাকে, সেরকম কোনো চালাকি বদরুজ্জামানের লেখায় থাকে না। বৈষম্যের বিষদাঁত আর জটিল মনস্তত্ত্বের গুঢ় কথা—লোকঐতিহ্যকেন্দ্রিক জলের মতো ভাষায় বলতে পারাটাই তার বিশিষ্টতা। আমি যখন কোনোদিন নাটকের রিভিউ লেখা কাকে বলে বুঝি নাই, বা বুঝলেও লিখতে সক্ষম বলে নিজেকে ভাবি নাই, তখন এক দুরন্ত সাহসে তাঁর অহরকণ্ডলের নাট্যসমালোচনা লিখেছিলাম। সেকালে আমি হাতে লিখতাম এবং কপি না রাখার মতো বুদ্ধু ছিলাম বলে সে লেখা সত্যি লিখেছিলুম মর্মে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারব না। লেখাটা সুহৃদ কামালউদ্দিন কবির ভাইয়ের একটা বইয়ের জন্য দিয়েছিলাম এবং কবির ভাই তাঁর কম্পিউটার হারানোর ফলে তাঁর টাইপ করা আমার লেখাটাও হারিয়েছে! ফেসবুকে দেখা গেল একজন সুহৃদ লিখেছেন “হারায়ে যাওয়া সহজ।” ভীষণ!
বদরুজ্জামান আলমগীরকে অনেকে নির্জনদা বলে সম্বোধন করেন, সেটা সহজও। নির্জনদা যেহেতু প্রবাসী তাই তাঁর সাথে আমার বেশি সাক্ষাৎ ঘটে নাই। জুমকে সাক্ষাৎ বললে সে মারফত এক বা দুইবার ২০২১ সালে; আর চর্মচক্ষে একবারই দেখেছিলাম। অহরকণ্ডলের প্রদর্শনীর সময় নাটমণ্ডলে নাটক দেখতে ঢুকছিলেন তখন সামান্য পরিচয়। এ বাদে ফেসবুকসূত্রে আলাপ। আমি তাঁর প্রথম যে লেখার সাথে পরিচিত হই তা কামালউদ্দিন কবিরের কাছ থেকে ধার করে পড়া নননপুরের মেলায় একজন কমলা সুন্দরী ও একটি বাঘ আসে। বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পের পক্ষে ছাপানো এই ৫০টাকা দামের বই বাজারে নেই বহুবছর হলো। ধার করে আনা বইটা ফেরত দিতে হয়েছিল বলে এর কোনো কপিও আমার কাছে কোনোকালে ছিল না। বইয়ের প্রথম নাটক পূণ্যাহ, অভিধান খুঁজে দেখতে হয়েছিল এ শব্দের অর্থ। পূণ্যাহ বা নননপুর এমন নাটক যেমন নাটকের সাথে বা নাটকের লেখার ধরনের সাথে সেই ১৯৯৭-৯৮ সালে আমার ভালো পরিচয় ছিল না। সেলিম আল দীনের লেখার সাথে তখন সবে সবে দেখা-শোনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ঢুকে পড়লেন নির্জনদা। তাঁর আর্দ্র শব্দগুচ্ছ-রূপক-প্রতীকের দৃশ্যকল্প নিয়ে। কাকরগাছি গ্রামের কোমরজড়ানো ঘোড়াউত্রা নদীর উপরের পাখির মেলা নিয়ে। ঘোড়াউত্রা এমন এক নদী যে ক্ষিপ্র এক পাগলের মতো লাফাতে পারে। আমি তো থ! এ কী কাণ্ড!
আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ময়মনসিংহ শহরে। ঘোড়াউত্রার নাম আমার অশোনা নয়। তখনো সৈয়দ শামসুল হকের নাটক না পড়া আমি আঞ্চলিক ভাষায় গ্রামীণ জনপদের নানা আচারের খোলস ভেঙে আচারিকের জীবন/লড়াই যখন চোখের সামনে ভাসতে দেখলাম তখন এরকমও ধন্দে পড়ছিলাম যে ঘোড়াউত্রা কি সময় না প্রকৃতি? নাকি দুটোই! বলাই বাহুল্য সবে সামাজিক বনায়নের নামে চালু কোর্স পড়তে পড়তে বন্দনা শিভা বা ইকোফেমিনিজমের বারান্দা দিয়ে ঘোরাঘুরি শুরু হয়েছিল তখন। ভাবছিলাম চরিত্র কোনগুলো, রঘুরা? নাকি ঘোড়াউত্রা? নাকি কাকরগাছি? এই গ্রামের নদীতে হাতি, জমিনে ঘোড়া! এঁরা কারা! সাহিত্যতত্ত্বতো তখন আমার তালাশে ছিল না! ইকোক্রিটিসিজম নিয়ে আলাপও তখনো বঙ্গোপসাগরের এই কূলে পৌঁছায় নাই। ফলে ততদিনে জানি নাই কিসে কী হয়! পাগলা গুড়ারে, কই’র মানুষ কই লইয়া যায়! মাথার ভিতর নানা প্রশ্ন জট পাকিয়ে থাকে, ছোটে না! একইরকম করে নননপুরের কথা বা অহরকণ্ডলের কথাও লেখা যায়। কিন্তু আসলে তো সেসব নিয়ে লিখতে বসি নাই। এই লেখাটাও লেখার কথা না। নাটকটা করতে পারলাম না বলেই নাটক নিয়ে লিখতে বসতে হলো—কোনটা যে বেশি খারাপ হলো নাট্যকারের জন্য সেটা এখনো ঠিক করে উঠতে পারি নাই।
নাটকে দেখা যায় কুরুমনি নামের এক বৃদ্ধা তার মুক্তিযুদ্ধ করতে গিয়ে ফিরে না আসা ছেলে জহরের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে মৃত্যুর দিন গোনে। গ্রামের সবাই তাকে প্রতিমুহূর্তে আশ্বাস দেয় যে জহর আসবে। পার হয়ে যায় দশকের পর দশক। আসেনি জহর। এই গ্রামে মেলা হয়, জীবন চলে, নদীর উপর লম্বা ব্রিজ হয়। কেবল কুরুমনির জীবন এক জায়গায় আটকে থাকে—অপেক্ষায়। এর মধ্যে আমরা জানতে পারি যে এই গ্রামের সকল ভরসার কেন্দ্রে আছেন কুমির শাহ যার মাজার বিলের ধারে! “যেদিন কুমির শাহ মারা গেলেন, সেইদিন কবরের পাড় থেকে কুমির রূপে বিলে গিয়ে নামেন—সেদিন থেকে আমাদের সব ভার তিনার উপর।” একদিন সকালে সেই কুমির শাহর মাজারের দিকে বিলের পাড়ে মূত্রত্যাগ করে এক অজানা মানুষ। কত্ত বড় সাহস! পুরো গ্রাম ঘিরে ধরে তাকে তার পরিচয় জানার উদ্দেশ্যে। কেউ ভাবে সে জহর, কিন্তু জানা যায় সে আলফ্রেড, আলফ্রেড পাহান। মুক্তিযুদ্ধে আশ্রয়হীন ভয়ার্ত হারিয়ে যাওয়া লক্ষীরানীকে খুঁজতে খুঁজতে সে এসে ঠেকেছে গোরাডোরা বিলের পারে। কিন্তু জহরের প্রেমে মাতাল কাজলবানু ভাবে আলফ্রেড জহরের ক্ষতি করে আসে। তাই সে জ্বিন চালান দেয় জহরের ঠিকানা খুঁজতে। জ্বিন জানায় জহর বেঁচে আছে। আসলে কি জহর বেঁচে আছে কিনা না জানলেও কুরুমনি অপেক্ষায় থাকতে থাকতে গুলিয়ে ফেলে আজরাইল না জহর কে কড়া নাড়ে তার দরজায়। অপেক্ষার শেষে মুক্তি মেলে কিনা, নাকি অপেক্ষার শেষই মুক্তি সে প্রশ্নের জবাব পাঠককে খুঁজে বের করার দায়িত্ব দিয়ে নাটক শেষ করেন বদরুজ্জামান আলমগীর!
নাটকটার মধ্যে এক উচাটন সুফি নির্লিপ্ততা আছে। আছে ঘুরতে থাকা চাকা—জীবনের চাকা, এক্সপ্রেশনের চাকা। যার সূত্র খুঁজতে আমরা আশ্রয় করেছিলাম মধ্য এশিয়ার সুফি ঐতিহ্যকে। আজারবাইজানি, তুর্কি বা পারসিক মেভলানাদের চরকির মতো ঘোরার মধ্যে দিয়ে নাটকটার মধ্যে ঘুরতে থাকা জনপদের ‘এক্সপ্রেশনের চাকাটা’র সাথে এক হতে চেয়েছিলাম। শব্দে-বাক্যে-অগল্পের গল্পে ছড়িয়ে থাকা মায়াকে যুক্তির সাথে না বরং সমর্পনে খুঁজে দেখতে চেয়েছিলাম।
এ পর্যায়ে বলে রাখা ভালো যে কেন করতে পারলাম না নাটকটা। জানুয়ারিতে মহড়া শুরু করে কিছুটা এগোতে পারলেও ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পার করে আমি এক বিরল অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত হয়ে গেলাম। পা থেকে শুরু হয়ে কাঁধপর্যন্ত অসার-অচল হয়ে পড়ল। ফুসফুসের পেশীগুলিও অচল হওয়ায় আমাকে লাইফ সাপোর্টে নিতে হলো। আমি জীবন-মৃত্যুর মাঝামাঝি ঝুলেছি। এসময় মনে হতো জীবনের যে এত মায়া, নাটকের সে মায়া রেখে, সমর্পণের সুযোগ হেলায় হারিয়ে ম’রে যাবো? আইসিইউতে আমার একটা গান শোনার ছোট যন্ত্র ছিল সেটায় আমাকে যেসব গান দেয়া হয়েছিল, তার মধ্যে আজারবাইজানের পিতা-মাতার ইরানী ঘরে জন্মানো ব্রিটিশ সুফি গায়ক সামি ইউসুফের অনেক কম্পোজিশন ছিল। ছিল পাকিস্তানী, ভারতীয় এবং দুই বাংলার আরো অনেক মানুষের গান। শায়ান, কফিল, মহীনের ঘোড়া, জেমস, সঞ্জীব, জন লেনন সকলেই ছিলেন। কিন্তু সুফি গানগুলোতে মায়া, প্রেম, অধরকে পাওয়ার বা তার সাথে মেলার আকাঙ্ক্ষায় মুক্ত হবার অপেক্ষা যেরকম ঘুর্নায়মান সেরকম অপেক্ষমান! আমি কই কই যে হারায়ে যেতাম সুরে আর মায়ায়। মনে হতো আমি নিজেই মেভলানা, ঘুরেই যাচ্ছি একটা কেন্দ্রের দিকে। সে কেন্দ্রকে যদি যুক্তি দিয়ে খুঁজি আমি পাই প্রকৃতিতে, মানুষের মুক্তিতে, প্রান্তিক মানুষের অপেক্ষায়, তার লড়াকুর ভাঙ্গা মুখের বলিরেখার ভাঁজে আলো আর আধারের খেলায়। এসবই বাহ্যিক যদিও অসত্য নয়।
নাটকটা পড়তে গিয়ে প্রথম থেকেই মনে হচ্ছিল—এটা একটা অপেক্ষার গল্প। এক জনপদের মুক্তির অপেক্ষা। প্রতীকে ঠাসা এ নাটকটা পড়ার ঠিক আগে আগে বটতলার একটা ভাবনা ছিল যে স্বাধীনতার ৫০তম বছরে এসে আমাদের মুক্তির বাসনা কতটা মিটল তা নিয়ে একটা মুক্তির উৎসব করার। যে উৎসবে আমরা খুঁজব এদেশে একজন নারীর, কৃষকের, আদিবাসী, হিন্দু বা ধর্মীয় বা জাতিগত ভাবে প্রান্তিক নাগরিকের মুক্তি মিলেছে কিনা! আমাদের অনেক পরিকল্পনা ছিল সে উৎসব নিয়ে। ঠিক এমন একটা সময়ে নাটকটা পড়েছিলাম বলেই—ওই রদ্যেভুটা হয়েছিল যোজনগন্ধা মায়ার সাথে। মনে হয়েছিল, কী আশ্চর্য! স্বাধীনতার পঞ্চাশে তো এমন নাটকই বটতলার করার কথা।
নাটকে কুরুমনির অপেক্ষা কেবল যুদ্ধে হারানো সন্তানের জন্য মায়ের একার অপেক্ষা না, এ অপেক্ষা পুরো জনপদের—কুমির শাহরূপী জনপদের চৈতন্য বা ভরসার মনস্তত্ত্বের একক প্রতীকও সেই অপেক্ষার অবসানে সফল হন না। কারণ একা তো কেউ মুক্তি এনে দিতে পারে না। মুক্তি আসতে হয় জনপদের ভেতর থেকেই। কুরুমনির অপেক্ষা যেমন শেষ হয় না, শেষ হয় না জনপদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও। আর মাতৃরূপিনী আলেক সাঁই আলো ঠিকরানো মাঝিমাল্লার দল নিয়ে আসমানের দরিয়ায় বৈঠা মারেন। যুক্তি আর মায়া—বস্তুবাদ আর মারেফত একে অন্যকে সাপের মতো পেঁচায়! যুক্তিবাদী নাস্তিক মানস সমর্পণের জন্য তৈরি হয়—আইসিইউতে ভেন্টিলটর চলে সস সস সস শব্দ করে। একটা একটা শ্বাস নেওয়া একটা একটা দেওয়া! জীবনের কেন্দ্রে, ঘূর্ণনের কেন্দ্রে এমনকি সমর্পণের এবং অবিশ্বাসেরও কেন্দ্রে যে শ্বাস সে শ্বাস ব্যাকুল করে, অস্থির করে, উন্মূলও করে অবিশ্বাসের উপর বহুদিনের বিশ্বাসকে। শ্বাসের মধ্যে অবিশ্বাস আর বিশ্বাস, যুক্তি আর সমর্পণ সাপের মতো হাঁটে!
কুমির শাহ’র মাজার মুখে ফরফর করে পেট খালাশ করে যে লোকটা সে রবার্ট ক্লাইভের বংশধরও না, বিশ্বাসঘাতকও না—সে জনপদেরই নিজ মানুষ আলফ্রেড পাহান যার স্মৃতিতে নিরন্তর খোঁজ চলে কেবল মনিহার বা লক্ষীরানির ভাঙ্গা মুখের। মনিহারকে বিক্রি করে তার বাবা নিজের আখের গুছায়। আর যুদ্ধের সময় অতিভোরে বেজান দৌড়ে চার্চে আশ্রয় খুঁজতে আসা লক্ষী রানিদের জায়গা না দিয়েও রেভারেন্ড যশোদারা অন্যায়কারীরা ধ্বংস হবে এই আশা বিক্রি করে প্রতিষ্ঠান বাঁচায়। পাহান লক্ষীকে বাঁচাতে না পারার বেদনায় তাকে খুঁজতে খুঁজতে খুঁজে পায় মনিহারকে। যার আঙ্গুলে ইন্দুরের বিষ! যে মনিহার ইন্দুরের গর্ত থেকে ধান টুকায়, চাল কুড়ায় আর যেতে চায় আসল সাপের কাছে। কুমির শাহ্র কাছে তার একটাই আর্তি— ‘আমারে সাপে কাটুক, পাহান’। সেই মনিহারকে হারিয়ে লক্ষীরানিকে খোঁজার গল্পের মাঝখানে পাহান আর বুঝে উঠতে পারে না যে সে আলফ্রেড নাকি যুদ্ধে গিয়ে ফেরত না আসা জহর! তাহলে কি তার হাতেই মুক্তি আসবে? যে জহরের অপেক্ষায় কুরুমনি আর সারা জনপদ সে মুক্তি কার হাত দিয়ে আসবে তবে: দাইনশা? জহর? দেড় ফুইট্টা সিরাজ? কাজল বানু?
জহরের জন্য ম্যাচবাত্তির লাহান জীবন পোড়ানো কাজল বানু কেন নেশার ঘোরে হাঁটে? সে নিজে নাকি মৃত্তিকা বরাবর—সে কি তবে প্রকৃতি? বদরুজ্জামান আলমগীর বারে বারে প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গকে চরিত্র করে তোলা থেকে নিজেকে মুক্ত করেন না। এ কি প্রেম না কৌশল? কাজলবানুর কৌশল কোনটা, কোনটা প্রেম? যখন সে নিজেকে মনে করে জহরের চোখের কাজল নাকি যখন সে জহরকে কেটে মাটিতে মিশিয়ে দিতে চায় আর তার হাতে ঝিকিয়ে ওঠে দা! মারে না জহরকে কাজল। তবু সেকি কৌশল না প্রেম? মাটি-আগুনের মেশামেশি কাজলের গায়ে নিশিন্দার ঘ্রাণ—মুক্তি না মিললে জহরকে না পেলে সে কেবল আশায় থাকে মুক্তির অথবা প্রেমের অথবা দুয়েরই। কাজলদের অপেক্ষার শেষ হয় না। কুরুমনিরও না। সন্তানের ফেরার অপেক্ষায় থাকা কুরুমনির মুখ আর মুক্তির প্রতীক্ষায় উন্মুখ জনপদ বাংলার মুখ মিলে যায়। আজরাইল ফেরেশতার বদলে কুরুমনির উঠানজুড়ে নেমে আসে আসমানের মগডাল থেকে একটি কাঁচা লাল রঙের ফোঁটা, না কী এক তিরতির কাঁপা উড়নি না কী জহর না কী মুক্তি!
কিন্তু আসমান থেকে মুক্তি তো আসার কথা না! মুক্তি তো আসমান থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়ার জিনিস না! মুক্তির আস্বাদ তো মাটিতে গাঁথা থাকতে হয়। মাটির সাথে দোস্তি হওয়া লাগে—জানি আকাশের কোনো ঠিক নেই, মাটি মরণেও দেয় স্বস্তি। সমর্পিত হতে চাইলেও এটুকু বুঝ তো টনটনেই ছিল আইসিইউতেও! স্বপ্নে ভাসতো মাসানুবোফুকোওকা, বোন বিড়বিড়িয়ে মুখস্ত করিয়ে গেল লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সোবহানাকা ইন্না কুন্তু মিনাযজোয়ালেমিন। অন্ধকারের জঙ্গলে ভাঙ্গা ডালে আমি তখন ছোট ফুল কত একা! অনেক উপরে উঠে যাওয়া রক্তচাপ আর হৃদয়ের দ্রুতগতিতে পাখা ঝাপটাই কারণ আমারও ডানা কাটা!
যোজনগন্ধা মায়া ইন্টারসেকশনালিটি বা আন্তঃপ্রবিষ্টতার কাঁচ দিয়ে বৈষম্যের নিগড় আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। যে বন্দিদশা পালটানোর জন্য কাজল বানু জীবনের ধুলা যত চোখের কাজল করে। রূপকথার গল্পে কাজললতা যেমন প্রতিটি সুঁচ রাজপুত্রের শরীর থেকে তুলে নিয়ে নিয়ে তাকে মুক্ত করে, নাটকের কাজল ততটা মুক্তির দিশা দেখায় না। দেখাতে পারত। হয়তো পাহানের বা জহরের বা আমাদের জনপদের মুক্তির জন্য কাজলের মতো ভালোবাসা বুকে করে সুঁচ তুলে নেওয়া কন্যাদের দরকার। সে দরকারটা নাটকে পরিষ্কার হলেও কাজলের হাতে মুক্তির চাবি তুলে দেননি বদরুজ্জামান আলমগীর। মাথা নত না করা কুরুমনি কি গঙ্গাবুড়ি হয়ে আমাদের প্রাণে প্রাণ মিলাতে নিয়ে যেতে পারত না ধুলার পাহাড়ে গঙ্গা বইয়ে দিতে? নির্জনদার সুহৃদ কফিল আহমেদের গঙ্গাবুড়ি যুক্তির আর সমর্পণের সাপাঘুড্ডির লেজের নাচের শেষটা দেখায়, দুলতে দুলতে ছুটে যায় তীরের ফলার মতো যত উপরে—প্যারাবোলার শেষে আবার তাকে ততটুকুই ফিরতে হয় মাটিতে—মধ্যাকর্ষণ! প্রাণে প্রাণ!
নাটকটা হলে কি মুক্তির চাবি কাজলের হাতে দিতে হতো? না দিয়ে কি পারতাম আমরা? কী পারতাম? উত্তর মঞ্চায়নের পরেই কেবল পাওয়া যাবে। সে পর্যন্ত তিরতির করে কাঁপতে থাকুক উড়নি অথবা মুক্তি অথবা জহর অথবা শ্বাসে শ্বাসে জীবন!
ধানমণ্ডি, ঢাকা